পশ্চিমবঙ্গ কর্মসংস্থান ব্যবসা বাণিজ্য টেক নিউজ স্কলারশিপ সরকারি প্রকল্প

জমি রেজিস্ট্রি করার আগে দিতে হবে ‘চোখের পরীক্ষা’! জালিয়াতি রুখতে নবান্নের মাস্টারস্ট্রোক ‘আপনি’ অ্যাপ

প্রতিবেদন: Pallabi Roy

প্রকাশিত:

আপনার জমি কি অজান্তে অন্য কেউ বিক্রি করে দিচ্ছে? আপনার জমি অন্য কেউ রেজিস্ট্রি করে দিচ্ছে আপনি সেটি জানতেও পারছেন না। আপনার মনেও যদি এমন দুশ্চিন্তা থেকে থাকে তাহলে এবার থেকে এই দুশ্চিন্তা দূর হলো। জমি ও বাড়ি কেনাবেচায় জালিয়াতি বন্ধ করতে এবং ভুয়ো মালিক সেজে সম্পত্তি হস্তান্তরের মতো ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ করতে এবার প্রযুক্তির চরম কড়াকড়ি আনছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। এর ফলে কারো জমি আর কেউ অন্য মালিক সেজে বিক্রি করতে পারবেনা। নবান্ন সূত্রে খবর, ‘আপনি’ (APNI) নামে একটি অত্যাধুনিক মোবাইল অ্যাপ চালু করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে রেজিস্ট্রি অফিসে আসা ক্রেতা-বিক্রেতার পরিচয় রেজিস্ট্রেশনের আগেই ১০০% নিশ্চিত করা হবে। এই পরিচয় যাচাই না হলে রেজিস্ট্রির ফাইল এক চুলও এগোবে না। কারো যদি তথ্যের মিল না থাকে বা এই অ্যাপে যদি ভুল বলে দেয় তাহলে তাহার জমি রেজিস্ট্রি করা মুশকিল হয়ে যাবে।

কীভাবে কাজ করবে এই ‘আপনি’ অ্যাপ?

এমনভাবে এই অ্যাপটি তৈরি করা হচ্ছে যাতে জালিয়াতি করা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। এবার জমি রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে সরকার এর জন্য বায়োমেট্রিক এবং অত্যাধুনিক ভৌগোলিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এর ফলে কার জমি

১. আধারের মাধ্যমে চোখের মনি যাচাই (Iris Scan): যারা জমি বিক্রি করবেন এবং যারা কিনবেন তাদের প্রত্যেককেই জমি কেনা বেচার আগে তাঁদের স্মার্টফোনে মাত্র ৪ এমবি-র এই ‘আপনি’ অ্যাপটি ডাউনলোড করতে হবে। এটি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে নবান্নের তরফ থেকে। অ্যাপে নির্দিষ্ট আবেদন নম্বর দেওয়ার পর ব্যক্তিকে ফোনের ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে দুইবার চোখের পাতা ফেলতে হবে। এটি আপনি নিজে নিজেও করতে পারবেন। এই প্রক্রিয়ায় চোখের মনির স্ক্যান সরাসরি আধার ডেটাবেসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। যদি আধার ডাটাবেসের সঙ্গে তথ্য সম্পূর্ণরূপে মিলে যায় তাহলে কোন ভয় নেই কিন্তু যদি আধারের সঙ্গে তথ্য না মিলে তাহলে সমস্যা। এই যাচাই সফল হলে তবেই রেজিস্ট্রেশনের পরের ধাপে যাওয়া যাবে। তবে অনেকের যদি আধারের তথ্যে ভুল থেকে থাকে বা আধারে বায়োমেট্রিক না থাকে তাহলেও সেক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে তাই জমি রেজিস্ট্রি করার আগে অবশ্যই আধারের তথ্য মিলিয়ে নিতে হবে এবং আধারে বায়োমেট্রিক করিয়ে রাখতে হবে।

২. ‘জিও-ফেন্সিং’ প্রযুক্তি (Geofencing): আপনি হয়তো ভাবছেন এই প্রক্রিয়া আপনি ঘরে বসেই করতে পারবেন। তবে আপনার এই ধারণা ভুল। আপনি ঘরে বসে এই যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন না। সরকার এর জন্য জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এর মানে হলো, ক্রেতা বা বিক্রেতাকে আগে থেকে রেজিস্ট্রি অফিসের নির্দিষ্ট এলাকায় উপস্থিত থেকেই কেবল এই যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। অফিসারদের সামনে এবং তাদের দাড়ায় এই ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।  অন্য কোনো জায়গা থেকে যাচাই করার চেষ্টা করলেই অ্যাপটি তা আটকে দেবে।

কবে ও কোথায় চালু হচ্ছে এই ব্যবস্থা?

নবান্ন সূত্রে জানা গেছে, আগামী সপ্তাহ থেকেই বিধাননগর পুরসভা এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে (Pilot Project) এই ‘আপনি’ অ্যাপের ব্যবহার শুরু হবে। প্রথমে এটি সমগ্র রাজ্যে জুড়ে চালু হবে না প্রথমে প্রায় দু’সপ্তাহের ট্রায়াল সফল হলে ধাপে ধাপে দুর্গাপুজোর আগেই গোটা পশ্চিমবঙ্গে এই ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে অর্থ দফতরের। এর ফলে সমগ্র রাজ্যজুড়ে জমি মাফিয়া এবং জমি জালিয়াতি অনেকটাই কমবে।

কেন এই নয়া উদ্যোগ?

এর আগেও জমি জালিয়াতি ঠেকাতে রেজিস্ট্রির সময় মোবাইলে ওটিপি (OTP) পাঠানোর ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। তবে এর ফলেও অনেক জালিয়াতি হয়েছে এবং জালিয়াতি বন্ধ করা যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে ওটিপি জালিয়াতি করে বা ফোনের তথ্য চুরি করে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। ওটিপি ব্যবস্থা ব্যর্থতায় রাজ্য সরকার চালু করলো নতুন এক পদ্ধতি। এর ফলে কারো তথ্য কেউ চুরি করতে পারবেনা এবং সঠিক ব্যক্তি উপস্থিত থেকে জমি রেজিস্ট্রি দিলে তাহলেই জমি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। রাজ্য সরকারের নয়া এই পদ্ধতি খুঁজতে বর্তমান সরকার এই ‘আপনি’ অ্যাপের উদ্যোগ নেয়।

জালিয়াতি কি সত্যিই কমবে?

প্রশাসন মনে করছেন, রাজ্যে নতুন এই ব্যবস্থা চালু হলে জমির জালিয়াতি বিশেষ করে ভোট ব্যক্তি সাজিয়ে জমি কেনা বেচা পরিচয় গোপন করে জমি আদান-প্রদান এবং মালিকের অজান্তেই জমি বিক্রি হয়ে যাওয়া এই দুর্নীতি পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। এবার থেকে জমি কেনা বেচার জন্য ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়কেই সশরীরে উপস্থিত থাকতে হবে এবং উভয়কেই এই অ্যাপের মাধ্যমে আধার অথেনটিকেশন করে তারপরেই জমি হস্তান্তর করা হবে বা কেনাবেচা করা হবে। এর ফলে জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং সাধারণ মানুষ নিশ্চিন্তে তার জমি কেনাবেচা করতে পারবে।

Leave a Comment