ভারতের ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প এবং হস্তশিল্পকে নতুনভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে কেন্দ্র সরকারের অন্যতম বড় উদ্যোগ হল Ministry of Micro, Small and Medium Enterprises পরিচালিত PM Vishwakarma Yojana। এবার পশ্চিমবঙ্গেও ১ জুন থেকে জোরকদমে শুরু হতে চলেছে এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন। ফলে রাজ্যের হাজার হাজার কারিগর, শিল্পী এবং হস্তশিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষ বড়সড় সুবিধা পেতে চলেছেন।

এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হল বহু বছর ধরে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পেশার সঙ্গে যুক্ত অথচ আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা শ্রমজীবী মানুষদের আর্থিক সহায়তা, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং স্বল্প সুদের ঋণের মাধ্যমে স্বনির্ভর করে তোলা। সরকার চাইছে, গ্রামের ছোট ছোট কারিগরদের কাজ যেন শুধু স্থানীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত সরঞ্জামের সাহায্যে তারা বড় বাজারেও নিজেদের জায়গা তৈরি করতে পারেন।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ইতিমধ্যেই লক্ষাধিক মানুষ এই প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছেন। এবার বাংলার কারিগরদের জন্যও খুলে যাচ্ছে নতুন সুযোগের দরজা।
কারা পাবেন PM Vishwakarma Yojana-র সুবিধা?
এই প্রকল্পের আওতায় মূলত ১৮ ধরনের ঐতিহ্যবাহী পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল—
- তাঁতি
- কামার
- কুমোর
- দর্জি
- রাজমিস্ত্রি
- কাঠমিস্ত্রি
- ভাস্কর
- মুচি বা চর্মকার
- ঝুড়ি প্রস্তুতকারক
- নৌকা নির্মাতা
- মালাকার
- পাথর খোদাই শিল্পী
- তালা প্রস্তুতকারক
- হাতুড়ি ও সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক
এছাড়াও অন্যান্য বহু হস্তশিল্পী ও কারিগর এই প্রকল্পের আওতায় আসতে পারেন। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার ছোট ব্যবসায়ী এবং স্বনির্ভর শিল্পীদের জন্য এই প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
কী কী সুবিধা মিলবে এই প্রকল্পে?
১) ফ্রি স্কিল ট্রেনিং
প্রথমেই নির্বাচিত আবেদনকারীদের আধুনিক প্রযুক্তি এবং উন্নত কাজ শেখানোর জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কারিগররা নতুন যন্ত্রপাতি ব্যবহার, পণ্যের মান উন্নয়ন এবং বাজারে প্রতিযোগিতামূলকভাবে কাজ করার কৌশল শিখতে পারবেন।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, এই প্রশিক্ষণে বাস্তবভিত্তিক কাজের ওপর বেশি জোর দেওয়া হবে।
২) প্রতিদিন ₹৫০০ স্টাইপেন্ড
প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় যাতে উপার্জনে সমস্যা না হয়, তার জন্য প্রশিক্ষণকালীন প্রতিদিন ₹৫০০ করে স্টাইপেন্ড সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হবে।
অর্থাৎ প্রশিক্ষণ চলাকালীনও আর্থিক সহায়তা মিলবে।
৩) ₹১৫,০০০ টাকার ফ্রি টুলকিট ইনসেনটিভ
প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পূর্ণ করার পর আবেদনকারীদের আধুনিক সরঞ্জাম কেনার জন্য এককালীন ₹১৫,০০০ টাকা দেওয়া হবে।
এই অর্থ দিয়ে তাঁরা নিজের পেশার উপযোগী উন্নত মানের যন্ত্রপাতি বা টুলকিট কিনতে পারবেন। ফলে কাজের গতি যেমন বাড়বে, তেমনই পণ্যের মানও উন্নত হবে।
৪) ₹৩ লক্ষ পর্যন্ত কম সুদের ঋণ
এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল গ্যারান্টি ছাড়াই ঋণের সুবিধা।
প্রথম ধাপ:
প্রথমে ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণের জন্য ₹১ লক্ষ পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হবে। এই ঋণ পরিশোধের জন্য প্রায় ১৮ মাস সময় পাওয়া যাবে।
দ্বিতীয় ধাপ:
প্রথম ঋণ সঠিকভাবে শোধ করতে পারলে অতিরিক্ত ₹২ লক্ষ পর্যন্ত ঋণ পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হল, এই ঋণের সুদের হার সাধারণ ব্যবসায়িক ঋণের তুলনায় অনেক কম রাখা হয়েছে।
বাংলার কুটির শিল্পে নতুন দিশা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গের কুটির শিল্প ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বাংলার তাঁত শিল্প, মৃৎশিল্প, কাঠের কাজ, চামড়ার কাজ এবং হস্তশিল্প বহু বছর ধরেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জনপ্রিয়। কিন্তু পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা এবং আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে বহু শিল্পী পিছিয়ে পড়ছিলেন।
PM Vishwakarma Yojana চালু হলে সেই সমস্ত কারিগর নতুনভাবে ব্যবসা বাড়ানোর সুযোগ পাবেন।
বিশেষ করে গ্রামীণ যুবকদের কর্মসংস্থান তৈরিতেও এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
কীভাবে আবেদন করবেন?
আবেদন করা যাবে অনলাইন এবং অফলাইন— দুই পদ্ধতিতেই।
অফলাইনে আবেদন পদ্ধতি
যারা অনলাইনে আবেদন করতে সমস্যায় পড়েন, তারা নিকটবর্তী CSC (Common Service Centre)-এ গিয়ে আবেদন করতে পারবেন।
সেখানে—
- আধার কার্ড
- ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট
- মোবাইল নম্বর
- পেশার তথ্য
যাচাই করে আবেদন জমা নেওয়া হবে।
অনলাইনে আবেদন করার ধাপ
প্রথমে PM Vishwakarma Official Portal-এ যেতে হবে।
তারপর—
- “Login” অপশনে ক্লিক করুন
- “Applicant/Beneficiary Login” নির্বাচন করুন
- আধার-লিঙ্ক মোবাইল নম্বর দিয়ে OTP ভেরিফিকেশন করুন
- আবেদন ফর্মে ব্যক্তিগত তথ্য পূরণ করুন
- প্রয়োজনীয় নথি আপলোড করুন
- ফর্ম সাবমিট করুন
সফলভাবে আবেদন সম্পন্ন হলে একটি Application ID দেওয়া হবে, যার মাধ্যমে পরবর্তীতে স্ট্যাটাস চেক করা যাবে।
কী কী নথি লাগবে?
আবেদনের সময় সাধারণত যেসব নথি প্রয়োজন হতে পারে—
- আধার কার্ড
- ভোটার কার্ড
- রেশন কার্ড
- ব্যাঙ্ক পাসবুক
- মোবাইল নম্বর
- পাসপোর্ট সাইজ ছবি
- পেশার প্রমাণপত্র (যদি থাকে)
১ জুন থেকে বাংলাজুড়ে শুরু হতে পারে বিশেষ ক্যাম্প
সূত্রের খবর, ১ জুনের পর ব্লক, পৌরসভা এবং CSC কেন্দ্রগুলিতে বিশেষ ক্যাম্পের মাধ্যমে আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। গ্রামীণ এলাকায় সচেতনতা বাড়ানোর জন্য প্রশাসনের তরফেও প্রচার চালানো হতে পারে।
অনেকের মতে, এই প্রকল্প বাংলার ছোট ব্যবসায়ী এবং হস্তশিল্পীদের অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী করে তুলতে বড় ভূমিকা নেবে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প?
বর্তমানে বাজারে প্রতিযোগিতা অনেক বেড়েছে। বড় বড় কোম্পানির সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে ছোট কারিগরদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারি প্রশিক্ষণ, আধুনিক সরঞ্জাম এবং স্বল্প সুদের ঋণ তাঁদের ব্যবসাকে নতুন গতি দিতে পারে।
শুধু তাই নয়, এই প্রকল্পের মাধ্যমে বহু তরুণ-তরুণী আবার ঐতিহ্যবাহী পেশার দিকে আগ্রহী হতে পারেন। ফলে বাংলার হারিয়ে যেতে বসা বহু শিল্প আবার নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| প্রকল্পের নাম | PM Vishwakarma Yojana |
| শুরু | ১ জুন ২০২৬ |
| সুবিধা | প্রশিক্ষণ, টুলকিট, ঋণ |
| টুলকিট সহায়তা | ₹১৫,০০০ |
| ঋণ সুবিধা | ₹৩ লক্ষ পর্যন্ত |
| স্টাইপেন্ড | প্রতিদিন ₹৫০০ |
| আবেদন পদ্ধতি | অনলাইন ও CSC কেন্দ্র |
| অফিসিয়াল পোর্টাল | pmvishwakarma.gov.in |
